বরিশাল ভ্রমণ ও তার ইতিকথা - অন্তিম পর্ব
গত পর্বে ভ্রমণের কিছু অংশ বাদ রেখেছিলাম এই ভেবে যেন পাঠকরা ভ্রমণকাহিনির মজাটা হারিয়ে না ফেলে। তাই না বলা অংশটুকু আজ উল্লেখ করছি।
![]() |
| বরিশাল ভ্রমণ ও তার ইতিকথা - অন্তিম পর্ব |
বরিশাল নতুল্লাবাদ বাস স্ট্যান্ডে এসে পৌঁছেছি। এখন উদ্দেশ্য পেট-পুজো করা। ভেবেছিলাম বরিশালের ঐতিহ্যবাহী কিছু খাবারের স্বাদ গ্রহন করবো। কিন্তু আমাদের তেমন জানা ছিলনা কিছুই। তাই অগত্যা আমার বিখ্যাত ফুডব্লগার বন্ধু আসাদুজ্জামান আসাদ কে ক্ষুদেবার্তা পাঠালাম। বন্ধু তার অর্ধাঙ্গিনীর সাথে বহু-বর্ষ পর ঘুরতে বেরিয়েছিল কিন্তু বন্ধুর টানে বন্ধু সব উপেক্ষা করে হন্য হয়ে আমাকে কিছু ঐতিহ্যবাহী খাবারের লিস্ট ধরিয়ে দিলেন। কিন্তু হায় এই দুপুর সময় এসব কোথায় খুজে পাবো, এদিকে ক্ষুধার আক্রমণে আমরা প্রায় কুপোকাত। এর মধ্যেই নজরে এলো বিখ্যাত নাজেম'স বিরিয়ানি। তাই চললাম সেই বিরিয়ানি খাওয়ার উদ্দেশ্যে। অবশেষে ভোজন বিলাশ করে নিজেদের পেটকে শান্ত করে আমরা যেখানে তৃপ্তির ঢেকুর তুলতে ব্যস্ত সেখানে রায়হান শাফি ভাই আবারো শৌচালয় ভ্রমনে ব্যস্ত।
আমরা এই যাত্রায় যতগুলা জায়গা ঘুরেছি তার চেয়ে বেশি শৌচালয় ঘুরেছেন তিনি তা হলফ করে বলতে পারি। নাজেম'স স্পেশাল কাচ্চি বিরিয়ানি যথেষ্ট ভালো ছিল। বরিশাল অঞ্চলে এত ভালো কাচ্চি বিরিয়ানি পাবো তা আমার ছোট্ট মস্তিষ্ক কখনো কল্পনা করেনি। পেট-পুজো শেষে সোজা চললাম লঞ্চঘাটের উদ্দেশ্যে। সময় তখন প্রায় বিকাল তবুও মাথার উপরে আস্ত সূর্য ঘুরছিল। লঞ্চঘাটে গিয়ে লঞ্চের ছাদে উঠে, পরম বিকেলের অবিরাম বাতাস আর নদীর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতে দার্শনিক সাগর সাহেব তার পুরনো জীবনের কিছুটা স্মৃতি আমাদের শুনালেন। আমাদের সময় প্রায় শেষের দিকে তবুও কিছুই ঘুরা হয়নি কিন্তু সময়টাকে খুব ভালোভাবে উপভোগ করেছি তা বলা যায়। তারপর আমাদের গন্তব্য বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়। বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতে হলে কীর্তনখোলা নদী পার করতে হয়। নদীর উপরে ঠায় দাঁড়িয়ে আছে দপদপিয়া ব্রিজ। বাংলাদেশের উচু ব্রিজ গুলোর একটি। এর কারণ এর নিচে দিয়ে বরিশাল-ঝালকাঠি-পটুয়াখালির লঞ্চ যায়। এটি আব্দুর রব সেরনিয়াবাদ ব্রিজ নামেও পরিচিত। ব্রিজের উপর থেকে কীর্তনখোলা নদীর সৌন্দর্য্য উপভোগ করা যায়। খুব ভোড়ে অথবা বিকালে লোকজন ভীড় করে এই সৌন্দর্য্য উপভোগ করতে। তাই সবাই ভাবলো কেননা নদীর সৌন্দর্য উপভোগ করতে হেটেই ব্রিজ পার হওয়া যাক। যেই ভাবা সেই কাজ। রূপাতলি বাস স্ট্যান্ডে নেমে হাটা শুরু করলাম ববির উদ্দেশ্যে। কাজটা আমাদের জন্য তেমন অসুবিধার না হলেও, রায়হান শাফির জন্য ছিল তার জীবনের সবচেয়ে করুন চ্যালেঞ্জ। এই ইয়া বড় একটা ভুড়ি নিয়ে প্রায় ৫ কিলোমিটার পথ পাড়ি দেওয়া প্রায় অনন্ত জলিলের অসম্ভবকে সম্ভব করার চেয়েও কঠিন কাজ। কিন্তু বগুড়ার ছেলে কি আর হার মানে? সে এই অসাধ্য কে সাধন করেছে তবে এর ফলে আগামী ৭ দিন সে বিছানা থেকে উঠতে পারেনি। আমাদের গল্পে ফেরা যাক- কীর্তনখোলা নদীর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতে পৌঁছে গেলাম বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়। খানিকটা ক্যাম্পাস ঘুরে এক জায়গায় বসে কিছুক্ষন জিরিয়ে নিলাম। যদিও সে চত্বরের আসল নাম কি তা জানা হয়নি। এই চত্বরের হাজারটা নামকরণ দেখে আর আসল নামটাই জানা হয়নি। ক্যাম্পাস ভ্রমণ শেষ, এখন ফেরার পালা। ঘড়িতে সময় প্রায় ৬ টার কাছাকাছি। সেখান থেকে সোজা নতুল্লাবাদ বাস স্ট্যান্ডে চলে গেলাম। যেহেতু হাতে বেশ কিছুটা সময় ছিল তাই বরিশালের বিখ্যাত মন্টু মামার চা'র স্বাদ গ্রহণ করতে চলে গেলাম। সেই চা'র স্বাদ ছিল অতুলনীয়। এখনো মুখে লেগে আছে বলা যায়। হয়তো মন্টু মামার চা বা নাজেম'স বিরিয়ানি খেতে আবার কোন একদিন বরিশালে যাওয়া হবে। এবার আমাদের সময় একদমই শেষ।
কিন্তু বিপদটা এখনই শুরু হলো। আমাদের ট্যুরে বিপদ আসবেনা তা কি হয় নাকি। বাস স্ট্যান্ডে গিয়ে মাথায় হাত। বরিশাল টু গোপালগঞ্জ সরাসরি বাসের সময় শেষ। অনেক খোজাখুজি করেও কোন বাস পাওয়া গেলনা। একে তে তরুন বয়স, মাথায় এডভেঞ্চার গিজগিজ করে, তাই আমাদের জন্য এটা তেমন প্যারার বিষয় মনে হলোনা। কিন্তু সারাদিন ঝটিকা ট্যুরে দৌড়াদৌড়ি করে সবাই খুব ক্লান্ত ছিল তাই সরাসরি বাস পেলে বাড়িতে ফিরতে খুব সুবিধা হতো। কিন্তু যেহেতু কপালে নেই তাই অন্য ব্যবস্থার কথা ভাবা হলো। ভেঙ্গে ভেঙ্গে গোপালগঞ্জ যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো। প্রথমে মাহিন্দ্রা করে গৌরনদী, সেখান থেকে আবার মাহিন্দ্রা করে পয়সারহাট তারপর পয়সারহাট থেকে কোটালিপাড়া তারপর সেখান থেকে গোপালগঞ্জ। পয়সারহাট পর্যন্ত খুব ভালোভাবেই আসা হলো কিন্তু ঝামেলা বাধলো এরপর। রাত প্রায় অনেক। পয়সারহাট থেকে কোটালিপাড়া যাওয়ার তেমন গাড়ী নেই। যা দুই একটা ভ্যান আছে তাও ভাড়া তিনগুণ/চারগুণ। বাজেট ট্যুরে এত টাকা দিয়ে যাওয়াটা প্রায় বিলাশিতা বা বোকামি ছাড়া কিছুইনা। তারপর অনেক কাল অপেক্ষা করে একটা অটোরিক্সা পেয়ে কোটালিপাড়া চলে আসলাম। এবার তো ঝামেলা আরো একধাপ বেড়ে গেল। কোটালিপাড়া থেকে বেদগ্রাম বা গোপালগঞ্জ যাওয়ার কোন বাহন অবশিষ্ট নেই। তাও দু-একটা যা আছে তাদের ভাড়া শুনে মনে হচ্ছিল হেটেই গোপালগঞ্জ চলে যাই। তাই করলাম, হাটতে হাটতে বহুদূর পাড়ি দিলাম। কিন্তু রায়হান শাফি কি আর পারে? এমনিতেই দপদপিয়া ব্রিজ পাড় করে সে কাহিল। তার উপরে আবার এত পথ হাটা। তার পক্ষে আর সম্ভব ছিলনা। তাই সবার পিছনে পরে গেল হাটতে হাটতে। একেতো রাত তারউপরে একা একা হাটতে হাটতে বেচারা ভয়ে, ক্লান্তিতে পুরোটাই শেষ। মনে মনে তার ভ্রমণ সাথীদের চোদ্দগুষ্টি উদ্ধার করতে বাকি রাখেনি। যাক অবশেষে সবাই অনুধাবন করলো রায়হান শাফি অনেক পিছনে পরে গেছে তাই নানা ঝামেলা পেরিয়ে, ভ্যানে করে তাকে আমাদের মাঝে উপস্থিত করা হলে।
কিন্তু এখন আর কারোরই হাটার শক্তি নেই। তাই অগত্যা চেয়ে রইলাম কোন বাহনের অপেক্ষায়। অবশেষে উপরওয়ালার মনে হয় আমাদের মত কিছু অসহায় প্রানীর উপর দয়া হলো। হঠাৎ এক মিনি ট্রাক আমাদের ডাকে সাড়া দিল। উঠে পরলাম সবাই ট্রাকের পিছনে। আমার জন্য সবচেয়ে কষ্টসাধ্য ব্যাপার ছিল। জীবনে কোনদিন দেয়াল টপকাইনি আর ট্রাকে উঠা তো বহু দূরের কথা। তবুও ট্রাকের উচ্চতা ছোট হওয়ায় কোনমতে টেনে আমাকে উঠাতে সক্ষম হলো। এবার আমাদের ফেরার শেষ যাত্রা শুরু হলো। রাতের অন্ধকারে ট্রাকের প্রচন্ড গতিতে টান আর প্রচন্ড বাতাসের গতিতে মনে হয় আমাদের উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছিল। এই ট্যুরের সবচেয়ে উপভোগ্য সময় ছিল ট্রাকের পিছনে করে ফেরা। ভয় আর ভালো লাগার এক অসম মিশ্রিত অনুভূতি যা লিখে প্রকাশ করা যাবেনা। এভাবেই শেষ হলো আমাদের একদিনের বরিশাল ঝটিকা ট্যুর। পরেরদিন থেকে আমরা সবাই সুস্থ হলেও রায়হান শাফি তার পা নিয়ে খুব ভুগেছিলেন। যদিও তার ভাষ্যমতে তিনি এই ছোট্ট ঝটিকা ট্যুর অনেক উপভোগ করেছেন।
এই ছিল বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের প্রথম ঝটিকা ট্যুর। যদিও অনেক জায়গা ঘুরা হয়নি। কিন্তু সারাজীবন মনে রাখার মত একটা ট্যুর ছিল বলা যায়। ১০/১৫ বছর পর সবাই যখন নিজের জীবন, ক্যারিয়ার নিয়ে ব্যস্ত সময় কাটাবে তখন এই স্মৃতি রোমন্থন করেই কিছুটা অবসর সময় কাটানো যাবে। বর্ষাকাল ছিলনা তাই বিখ্যাত পেয়ারা বাজার যাওয়া হয়নি। সময়ের অভাবে গুঠিয়ার সন্দেশ, গৌরনদীর দধি অনেক ঐতিহ্যবাহী খাবারের স্বাদ নেওয়া হয়নি। হয়তো আবারো একদিন এমন ঝটিকা ট্যুর দিয়ে বাকি ইচ্ছাগুলো পূরন করে আসবো।
Mannequin Challenge
এত কষ্ট করে সময় অপচয় করে আবার আজগুবি, হাবিজাবি ভ্রমণ কাহিনি পড়ার জন্য অসীম ধন্যবাদ। আবারো কোন গল্প, রিভিউ, কাহিনি নিয়ে ফিরে আসবো আপনাদের মাঝে। ততদিন Fatman's Blogs এর সাথেই থাকুন। Stay Home, Stay Safe.


No comments