Header Ads

বরিশাল ভ্রমণ ও তার ইতিকথা - প্রথম পর্ব

বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে ট্যুরে যায়নি বা ট্যুর দেওয়ার ইচ্ছা হয়নি এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া বিরল। এই বয়সেই কেন জানি ভ্রমণের ইচ্ছাটা খুব বেশি জাগ্রত হয়ে উঠে। সেমিস্টার ব্রেক বা যেকোন ছুটিতে সময় পেলেই হলো, একটা ব্যাগে কিছু জামাকাপড় নিয়ে বেরিয়ে পরে অজানা উদ্দেশ্যে আবার কেও বা গন্তব্য ঠিক করেই বের হয়। ভ্রমণ করতে সবারই ভালোলাগে, কারো আবার ভ্রমণই নেশা, কারো পেশা।। তবে আমি এর মাঝামাঝি পর্যায়ের এক প্রাণী। এ পর্যন্ত পরিবারের সাথে দেশের অনেক পর্যটন জায়গা থেকে শুরু করে অনেক আনাচে-কানাচে ঘুরা হয়েছে। তবে এই লকডাউনে ঘরে বসে বসে বন্ধুদের সাথে জীবনের প্রথম একদিনের ছোট ট্যুর বা ঝটিকা ট্যুর এর কথা স্মরণ করার ইচ্ছা হলো। কেন ঝটিকা ট্যুর আখ্যায়িত করলাম তা একটু পরেই টের পাবেন।

বরিশাল ভ্রমণ ও তার ইতিকথা

দেখতে দেখতে ক্যাম্পাসে প্রায় ১ বছর অতিবাহিত করে ফেললাম কিন্তু আশেপাশে ছাড়া তেমন কোথাও যাওয়া হয়ে উঠেনি। দ্বিতীয় বর্ষে উঠে নানান ঝামেলায় জীবনটা বিভীষিকাময় হয় উঠেছিল। সেই বিষন্ন জীবন থেকে বিরতি নিতেই বন্ধুরা কোথাও যাওয়ার জন্য পাগলপ্রায় হয়ে উঠেছিল। কোথায় যাওয়া যায় এই ভাবতে ভাবতেই গুঞ্জন উঠল বরিশাল যাওয়া হবে। 
গোপালগঞ্জ থেকে খুব একটা দূরে নয়, দিন যেয়ে দিন ফেরত আসা যাবে। যদিও ট্যুরে যাওয়ার কোন পরিকল্পনা করা হয়নি। শুধু মুখে মুখেই বরিশাল যাওয়ার কথা ঠিক হলো। এদিকে আমার যাওয়ার তেমন ইচ্ছা নেই। পারিপার্শ্বিক অবস্থার কারণে নিজেকে ট্যুর থেকে বিচ্ছিন্ন রাখতে চেয়েছিলাম। কিন্তু আমার পরম বন্ধুরা তা মানতে নারাজ। পারলে তারা আমাকে চ্যাং-দোলা করে হলেও নিয়ে যাবে। আগেরদিন রাতে ট্যুরের মুখ্য পাত্র পটুয়াখালীর গর্ব, বন্ধু নাইম ফোন করে জানিয়ে রাখলো যেন আগামীকাল সকালে তৈরি হয়ে থাকি। আমি তো মনে মনে ভাবছি আগামীকাল সকালে যেন আমার ঘুম না ভাঙ্গে। কিন্তু কপালের লেখা তো আর ভাবনায় পালটায় না। পরের দিন সকালে সবাই ঘর থেকে বেরিয়ে পরেছে অথচ আমি তখনও পরম নিদ্রাও নিমজ্জিত। তবুও ফোনের আওয়াজে কিছুক্ষণ পর ঘুম থেকে উঠে, কোনরকমে কাপড় পরে বেরিয়ে পরলাম। বরাবরের মত আমি লেট। এ যেন আমার চির-চারিত স্বভাব, আমি লেট হবই। বাসা থেকে বেরিয়ে চৌরঙ্গি গেলাম, সেখান থেকে সাগর আর নাইমের সাথে যোগ দিয়ে সোজা বেদগ্রাম পৌঁছে গেলাম। ওদিকে আরেকগ্রুপ আগে এসে সকালের নাস্তা করতে ব্যস্ত। আর আমাদের পেটে তখনও কিছু পরেনি। আমার দেরি করার কারণে গোপালগঞ্জ থেকে বরিশাল যাওয়ার সরাসরি বাস মিস করলাম তাই স্থির করা হলো বেদগ্রাম থেকে পয়সারহাট তারপর সেখান থেকে সোজা বরিশাল। যেই ভাবা সেই কাজ৷ বাসে উঠে পরলাম, কোটালিপাড়া এসে বাস কিছুক্ষনের জন্য যাত্রাবিরতি দিল কিন্তু ওদিকে আমাদের বন্ধু, বগুরার শ্রেষ্ঠ পাবজি খেলোয়াড়, আমার অপ্রমাণিত যমজ ভাই ওরফে রায়হান শাফি সকাল বেলায় পরোটা-ডিম পেটে ঢুকিয়ে পেটের ভিতরে গন্ডগোল পাকিয়ে ফেলেছে। কোটালিপাড়ার যাত্রা বিরতিতে সে নেমে শৌচালয় খুজতে ব্যস্ত। অবশেষে অনেক খুঁজে না পেয়েই ফিরে আসতে হলো তাকে। বাস আবার চলতে শুরু করলো। পয়সারহাট পৌঁছে ভাবলাম পেটে কিছু দেওয়া যাক কিন্তু পরোটা খেয়ে আবার শাফির অবস্থায় যেন না পরতে হয় তাই চা-বিস্কুট খেয়েই শান্ত থাকলাম। পয়সারহাট থেকে বাসে উঠে এবার যাত্রা শুরু হলো বরিশালের উদ্দেশ্য। ছোটবেলা থেকে বরিশাল আর নোয়াখালী এই দুটো নাম সবথেকে বেশি শুনেছি কিন্তু কোনদিন যাওয়া হয়নি। তাই ভাবলাম এবার বরিশাল যেয়ে সেই স্বাদ পূরন করি। এদিকে পয়সারহাট থেকে টিকেট কেটে বাসে উঠলেও, বাস ছিল লোকাল বাস। দুই মিনিট পরপর যাত্রাবিরতি। এভাবে হেলতে দুলতে একসময় বরিশাল গড়িয়ারপাড় এসে নামলাম।

সেখানে নেমেই পেটের গন্ডগোলে অসহ্য রায়হান শাফি শৌচালয় খুজতে শুরু করল। যদিও এবার সে সফল। শৌচালয়ে প্রবেশ করে, শৌচালয়ের প্রেমে পরে তার আর বের হওয়ার ইচ্ছা হলোনা। এদিকে সময়ের পর সময় অতিবাহিত হচ্ছে কিন্তু তার আর আসার নাম-গন্ধ নেই। কি বিপদ, এদিকে একদিনের ভ্রমণযাত্রায়, ভ্রমণ শুরু করার আগেই অর্ধ বেলা শেষ। অর্ধ-বর্ষ কাল পেরিয়ে তিনি আমাদের মাঝে আবার উপস্থিত হলেন। তারপর রওনা দিলাম বরিশালের সবচেয়ে পরিচিত জায়গা দূর্গাসাগর দীঘির উদ্দেশ্যে। 

দুর্গাসাগর দিঘী

১৭৮০ সালে চন্দ্রদ্বীপের পঞ্চদশ রাজা শিব নারায়ন এই বিশাল জলাধারটি খনন করেন। তার স্ত্রী দুর্গামতির নামানুসারে এর নাম করন করা হয় দুর্গাসাগর। ১৯৭৪ সালে তৎকালিন সরকারের উদ্যোগে দিঘীটি পুনরায় সংস্কার করা হয়। বর্তমানে এটি "দুর্গাসাগর দিঘীর উন্নয়ন ও পাখির অভয়ারন্য” নামে একটি প্রকল্পের অধিনে বরিশাল জেলা প্রশাসন দিঘীটির তত্ত্বাবধানে রয়েছে। দুর্গাসাগরে পৌছে যে ব্যাপারটা বুঝলাম তা হলো এ পর্যটন কেন্দ্র পরে আগে এটি কপোত-কপোতীর প্রেমস্থল। সেখানে পাখির চেয়ে প্রেমিক-প্রেমিকার সংখ্যা বেশি। প্রায় সব ধরনের বয়সের প্রেমিক-যুগল চোখে পরবে। এদিকে দুর্গাসাগরে পৌছে সাতক্ষীরার সুদর্শন ছেলে বিজয় ঘোষ রমনী দর্শনে ব্যস্ত হয়ে পরল। কিন্তু ওদিকে আমাদের প্রিয় বন্ধু, ছ্যাকা খেয়ে ব্যাকা হয়েও সোজা ছেলে, নাজমুল হাসান চারপাশে এত প্রেমিক যুগল দেখে দুঃখে-কষ্টে চৌচির। অপরদিকে দার্শনিক সাগর সাহেব তার সেনাপতি মীর বংশের গৌরব সুফিয়ান রিমন মীরকে নিয়ে প্রকৃতি দর্শন করতে মনঃস্থির করলেন। আরেকদিকে সবার উপকারী বন্ধু নাইম তার বিখ্যাত স্যামসাং A50 দিয়ে সবার স্থিরচিত্র তুলে দিয়ে সবাইকে সহযোগীতায় ব্যস্ত হয়ে পরলেন। এদিকে আমি আমার একমাত্র হাটার সাথী, আমার ভাই শাফির সাথে হেটে হেটে দুর্গাসাগর দিঘী প্রদক্ষিণ করে ক্লান্ত হয়ে গেলাম। দুর্গাসাগর দিঘির প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে আমাদের প্রাণ ভরে উঠলো। তবে রায়হান শাফি এখানেও শৌচালয়ে গিয়ে আমাদের সময় নষ্ট করেছেন। 

দুর্গাসাগর থেকে বেরিয়ে গুঠিয়া মসজিদের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। এদিকে হাতে সময় কম তাই ভ্যানে করেই যাত্রা শুরু করলাম। মাধবপাশা গ্রামের উপর দিয়ে ভ্যান সাই-সাই করে চলছিল আর দুপুরের রৌদ্রোজ্জ্বল দিনেও আমরা ভ্যান যাত্রা খুব উপভোগ করছিলাম। মাঝখানে একজায়গায় ব্রিজ ভাঙ্গা ছিল তাই নেমে হেটে ব্রিজ পার হয়ে অপরপাশ থেকে আবার ভ্যান ভাড়া করে আবার যাত্রা শুরু হলো। অবশেষে কিছুক্ষন পর গুঠিয়া মসজিদে পা রাখলাম। আমার দেখা অন্যতম সুন্দর মসজিদ। 

গুঠিয়া মসজিদ

উজিরপুর উপজেলার গুঠিয়ার চাংগুরিয়া গ্রামে দক্ষিণাঞ্চলের এই বৃহৎ মসজিদটি অবস্থিত। ২০০৩ সালে উজিরপুরের গুঠিয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা শিক্ষানুরাগী এস. সরফুদ্দিন আহম্মেদ সান্টু চাংগুরিয়ার নিজবাড়ির সামনে প্রায় ১৪ একর জমির উপর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের মধ্য দিয়ে ব্যক্তিগতভাবে গুঠিয়া বাইতুল আমান জামে মসজিদ- ঈদগাহ্ কমপ্লেক্স এর নির্মান কার্যক্রম শুরু করেন। ২০০৬ সালে উক্ত জামে মসজিদ-ঈদগাহ্ কমপ্লেক্সের নির্মান কাজ সম্পন্ন হয়।এই মসজিদ কমপ্লেক্সের ভেতরে একটি বৃহৎ মসজিদ-মিনার, ২০ হাজার অধিক ধারণক্ষমতা সম্পন্ন ঈদগাহ্ ময়দান, এতিমখানা, একটি ডাকবাংলো, গাড়ি পার্কিংব্যবস্থা, লেক-পুকুরসহ বিভিন্নপ্ রজাতির ফুলের বাগান রয়েছে। কমপ্লেক্সের মূল প্রবেশ পথের ডানে বড় পুকুর।পুকুরের পশ্চিম দিকে মসজিদ, এক সঙ্গে প্রায় দেড় হাজার মুসল্লী নামাজ পড়তে পারে। মসজিদ লাগোয়া মিনারটির উচ্চতা ১৯৩ফুট । ঈদগার প্রবেশ পথের দুই ধারে দুটি ফোয়ারা আছে। এই মসজিদের নির্মাণ কাজে প্রায় ২ লাখ ১০ হাজার নির্মান শ্রমিক কাজ করেছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানায় ।পরে গুঠিয়ার নামেই মসজিদটি পরিচিতি লাভ করে। অতপর রায়হান শাফি এখানেও পুরোটা সময় শৌচালয়ে অবস্থায় করেছেন। গুঠিয়ার সৌন্দর্যে আমরা মুগ্ধ হয়ে, সামান্য স্মৃতিরক্ষার্থ বিনোদনের জন্য করে ফেললাম ম্যানিকুইন চ্যালেঞ্জ।


শৌচালয়ে ব্যস্ত থাকার দরুন রায়হান শাফি সেখানে অনুপস্থিত ছিলেন। গুঠিয়ার সৌন্দর্য উপভোগ শেষে বরিশাল শহরের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। তখন প্রায় মধ্য দুপুর মাহিন্দ্রাতে আমরা ৭ জন ক্ষুধার্ত প্রানী। তবুও গান, গল্প-গুজব করতে করতে প্রায় ১ ঘন্টা পর বরিশাল শহরে এসে পৌছলাম। 

এক পর্বে এতকিছু পড়তে পড়তে পাঠক সমাজ ক্লান্ত হয়ে যাবে তাই তাদের কথা মাথায় রেখে ভ্রমণের বাকি অংশ পরের পর্বের জন্য তুলে রাখলাম। খুব শীঘ্রই আগামী পর্ব পাবলিশ করা হবে। ধন্যবাদ এত সময় মনযোগ সহকারে আমার হাবিজাবি লেখা পড়ার জন্য।

No comments

Powered by Blogger.